এক ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হকের সিলেটে যুদ্ধে যোগদান

Posted by Anwar Hossan
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.
‘১৯৯৬ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়েছি। এর আগে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ও দিতে পারিনি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করার পর থেকে অনেক বছর ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় দিতে পারিনি।’ এভাবেই আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার দক্ষিণ আমবাড়িয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক। মুক্তিযুদ্ধের প্রথমভাগে গ্রামে গ্রামে রাজাকার-আলবদরদের নির্যাতন দেখে লড়াই করতে মুক্তিযুদ্ধে গেছেন ১৮ বছরের টগবগে তরুণ এনামুল। গ্রামের সকলে তাঁকে কেরানী বলেই ডাকে। মুক্তিযুদ্ধে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্মুখ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। অসীম সাহস, দেশপ্রেম আর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তাঁকে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছে। স্বাধীন দেশে এখনো পাকিস্তানী পন্থিদের রাজনীতি করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত আছে দেখে ক্ষাণিকটা বিস্মিত হন তিনি। স্থানীয় খৈয়াছরা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কমান্ডার মোঃ সফিউল আলম মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হকের বাড়ি চিনতে সাহায্য করেন। উপজেলার ১২ নম্বর খৈয়াছরা ইউনিয়নের পশ্চিম আমবাড়িয়া গ্রামে এনামুল হকের বাড়ি। বাড়ি বলতে একটা কুঁড়ে ঘর। ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে ছোট্ট ঘরে রান্না-বান্না খাওয়া-দাওয়া সব। স্ত্রী জুজিয়া বেগম চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন ২০১২ সালের জুন মাসে। বর্তমানে তিন মেয়ে ও তিন ছেলের সংসার তাঁর। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সকলে তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা কেরানী বলেই ডাকতো। ১৫ আগষ্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁকে আর কেউ মুক্তিযোদ্ধা বলে ডাকেনি। ৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলে যায় তাঁর নাম। সে থেকে গ্রামের সকলে তাঁকে ‘রিকশাওয়ালা’ কেরানী বলেই ডাকতো। অসীম সাহসিকাতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ মাতৃকার বিজয় ছিনিয়ে আনা মানুষটি জীবনযুদ্ধে সহ্য করছেন অসহনী যন্ত্রনা আর অভাব। একসময় দিনের সূর্য উঁকি দেয়ার আগেই এনামুল হকের রিকশার টুং টাং শব্দে গ্রামের মানুষের ঘুম ভাংতো। অসুস্থ শরীর নিয়ে এখন আর রিকশা চালাতে পারেন না। অবশ্য ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চিকিৎসার জন্য অনুদান হিসেবে দুই লাখ টাকা দিয়েছেন। ওই টাকায় তিনি খুপড়ি ঘরটাকে মেরামত করেছেন আর নিজের অসুস্থতার জন্য চিকিৎসা করিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা এনামুলের বাড়ি গিয়ে কথা হয় তাঁর সাথে। এতকষ্টে জীবন-যাপন করেও কোন আক্ষেপ নেই এনামুল হকের। তিনি এখনো গর্ব করেন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। তাঁর সোজাসাপ্টা কথা ‘৭ কোটি বাঙালীর স্বাধীনতা প্রয়োজনে যুদ্ধে গেছি, সরকার কিছু কিছু রাজাকারের বিচার শেষ করেছে। এখন আমার দাবি তাদের সমর্থিত রাজনৈতিক দল জামায়াত এবং শিবিরকে যেন নিষিদ্ধ করা হয়।’ কথা প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক জানান, ‘৯৬ সালে ৩০০ টাকা ভাতার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে স্বীকৃতি দিয়েছেন। বর্তমানে প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা ভাতা পান। ২০১৩ সালে চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী তাঁকে দুই লাখ টাকার অনুদান দিয়েছেন।’ মুক্তিযুদ্ধের সময় এনামুল হকের বয়স ১৮ বছর। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণ তাঁকে উজ্জীবিত করেছিল। এরপর আমবাড়ীয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সফিউল আলম তাঁকে মুক্তিযুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আওয়ামী লীগ নেতা জিতেন্দ্র প্রসাদ নাথ মন্টুর সাথে ট্রেনিং নিতে ভারতের হরিণা ক্যাম্পে যান। ভারতের হরিণা ক্যাম্প ও লোহার বন ক্যাম্পে ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরে প্রথমে সিলেটের রাণি বাড়িতে একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে যুদ্ধে যোগ দেন। একসপ্তাহ পর চট্টগ্রাম ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এনামুল হক বলেন, ‘রাজাকার আজহারের সোবহান ওরফে আজরাইলের সোবহান গ্রামের মেয়েদের এবং যুবক ছেলেদের পাকিস্তানীদের হাতে তুলে দিতো। পরে স্থানীয় তালবাড়ীয়া লোহার পুল এলাকায় তাদেরকে নির্যাতন করে খুন করা হতো। এসব নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মুক্তিযুদ্ধে গেছি।’ সিলেটের সম্মুখ যুদ্ধের বর্ণনা করতে গিয়ে এনামুল বলেন, ‘সিলেটের রাণি বাড়ি এলাকায় একটি রাজাকার ক্যাম্প ধ্বংসের দায়িত্ব পড়েছিল আমাদের ওপর। খুব সফল একটি অপারেশন হয়েছিল সেটি।’ মিরসরাই উপজেলার ওচমানপুরে ইউনিয়ন কমান্ডার আহছান উল্যার নেতৃত্বে যুদ্ধ করি। ওখানকার একটি ক্যাম্পে আমরা অবস্থান করলে পাকিস্তানীরা অতর্কিত হামলা করে। ওই হামলায় আমরা কজন মুক্তিযোদ্ধা অল্পের জন্য বেঁচে যাই। পরে আমরা আত্মরক্ষার্থে স্বন্দ্বীপের চরে অবস্থান করি। ডিসেম্বর মাসে ঐতিহাসিক কুমিরা যুদ্ধে অংশ নেন এনামুল। ওই যুদ্ধে তাঁর সামনেই ভারতীয় সেনা অফিসারসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন। এ যুদ্ধ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ আমরা পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সর্বত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুললে তারা পিছু হটে এবং তাদের বেশ কিছু সৈনিক নিহত হয়।’ সবশেষে এনামুল হক জানান, অভাব নিয়ে তাঁর কোন আক্ষেপ নেই, তবে তিনি বিস্মিত হন স্বাধীন দেশে রাজাকার ও তাদের দোসরদের রাজনীতি করতে দেখে। তিনি হতবাক হন যখন দেখেন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দলের লোকজনের সাথে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের মেলামেশা। সূত্র- http://www.dainikpurbokone.net/129739/%E0%A6%8F%E0%A6%95-%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A7%83%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A7%87/