নূর আহমেদ গাজী

Posted by AL Amin Khan
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.
১৯৭১ সালের আগস্ট মাস থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলের অবস্থান ছিল বাখরপুর গ্রামে। চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের অন্তর্গত বাখরপুর। চাঁদপুর শহর থেকে ছয় মাইল দূরে। মুক্তিযোদ্ধাদের দলনেতা নূর আহমেদ গাজী। দলে মুক্তিযোদ্ধা ৪৫ জন। ১ সেপ্টেম্বর শিবিরে (মজুমদারবাড়ি) নূর আহমেদ গাজীসহ মুক্তিযোদ্ধা মাত্র ১৮ জন। বাকিরা অন্যত্র একটি অপারেশনে গিয়েছেন। যাঁরা শিবিরে আছেন, তাঁরা বেশির ভাগই পরিশ্রান্ত। গত কয়েক দিন তাঁরা একের পর এক অপারেশন করেছেন। সেদিনও একটি অপারেশনে গিয়ে তাঁরা কয়েকজন রাজাকারকে আটক করেন। সেই রাজাকারেরা তাঁদের শিবিরে বন্দী। রাতে শিবিরে মুক্তিযোদ্ধারা ঘুমিয়ে। দু-তিনজন পাহারায় নিযুক্ত। চারদিক সুনসান। শুধু ঝিঁঝি পোকার ডাক আর অন্ধকারে জোনাকি পোকার আনাগোনা। শেষ রাতে (তখন ঘড়ির কাঁটা অনুসারে ২ সেপ্টেম্বর) নীরবতা ভেঙে হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ। মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা ঘুমিয়ে ছিলেন, তাঁরা উঠে পড়েন। কিছুটা হকচকিত। তবে দ্রুত তাঁরা নিজেদের সামলিয়ে নেন। নূর আহমেদ গাজীর ঘটনা বুঝতে দেরি হয়নি। তাঁদের অবস্থানে আকস্মিক আক্রমণ করেছে পাকিস্তানি সেনারা। তিনি সতর্কই ছিলেন। কারণ, তাঁর মনে হয়েছিল, আটক রাজাকারদের উদ্ধারে পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করতে পারে। এ রকম অবস্থায় পাল্টা আক্রমণ বা পালিয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা প্রথমটাই বেছে নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ছিল এসএলআর, স্টেনগান, রাইফেল আর হ্যান্ডগ্রেনেড। ভারী অস্ত্র ছিল মাত্র একটি। তা-ই সম্বল করে তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়লেন পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে। শত্রুরা কতজন, তাদের শক্তি কী, সেটা নূর আহমেদ গাজী তখন জানতেন না। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানি সেনা সংখ্যায় ছিল অনেক। অস্ত্রশস্ত্রও অত্যাধুনিক। বৃষ্টির মতো শত শত গুলি মুক্তিযোদ্ধাদের মাথার ওপর দিয়ে যেতে থাকে। পরে অবশ্য নূর আহমেদ গাজী জানতে পারেন, পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারেরা এসেছে ১১টি নৌকায়। সব মিলিয়ে তারা প্রায় ৯০ জন। তাঁদের কয়েক গুণ বেশি। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সকাল থেকে মুক্তিযোদ্ধারা নতুন উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করেন। প্রচণ্ড যুদ্ধে দুই পক্ষেই ক্ষয়ক্ষতি হয়। শহীদ ও আহত হন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারও হতাহত হয়। সকাল আটটার দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলি প্রায় শেষ হয়ে যায়। তখন তাঁরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে জীবিত সহযোদ্ধাদের পশ্চাদপসরণ করতে বলে নূর আহমেদ গাজী পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে একাই সম্মুখযুদ্ধ করেন। কিন্তু এই যুদ্ধ ছিল অসম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। নিভে যায় তাঁর জীবনপ্রদীপ। সেদিন এই যুদ্ধে নূর আহমেদ গাজীসহ আটজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। অন্য মুক্তিযোদ্ধারা পালাতে সক্ষম হলেও কমবেশি আহত হন। পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার ১৫-১৬ জন যুদ্ধে এবং আটক রাজাকার বেশির ভাগ ক্রসফায়ারে নিহত হয়।