প্রশিক্ষণ নিতে ছাতা বিক্রি করে ভারতে যান তাজুল

Posted by Anwar Hossan
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.
একাত্তরের ২৬ মার্চ সকালে মিরসরাইয়ের ফেনাপনি পুল এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের পথ আটকাতে সড়কে ব্যারিকেড দিয়েছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। ওই দলে ছিলেন ১৯ বছরের টগবগে তরুণ তাজুল ইসলামও। সেই ঘটনার পর সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধে যাওয়ার। প্রশিক্ষণ নিতে নিজের কাছে থাকা ছাতা বিক্রির টাকায় পাড়ি জমান ভারতে। দেশে ফিরে বেশ কয়েকটি সফল অপারেশনে অংশ নেন তিনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলামের বাড়ি মিরসরাইয়ের পূর্ব খৈয়াছরা গ্রামে। তাঁর বাবা মরহুম আমির হোসেন। তিনি দুই সন্তানের বাবা। স্ত্রী ফেরদৌস আরা বেগম গৃহিণী। একাত্তরে মিরসরাই পাইলট স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন তাজুল ইসলাম। জহির উদ্দিন নামে এক প্রতিবেশী যুবকের সাথে পরামর্শ করে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে জানা নেই ভারতে যাওয়ার পথ, চেনেন না প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। শরণাপন্ন হন পার্শ্তবর্তী তাকিয়া গ্রামের সিদ্দিক আহম্মেদের কাছে। তিনি আগে থেকে ভারতে যাতায়াত করতেন নানা কাজে। দুজনকে ভারতের শ্রীনগরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিনিময় হিসেবে টাকা দাবি করেন সিদ্দিক। সেদিন তাজুলের পকেটে ছিল ৪৫ টাকা, সঙ্গে ছিল একটি ছাতা। টাকার জোগান দিতে ওই ছাতা বিক্রি করে দেন। প্রথমে বাসে চড়ে শুভপুর সেতু। এর পর ফেনীর ছাগলনাইয়া হয়ে পাড়ি জমান ভারতে। বড়তাকিয়া থেকে বাস রওনা হলে মিরসরাই থানার সামনে স্থানীয় রাজাকার শিরোমনি আজহারের ছোবহান ওরফে আজরাইলের ছোবান বাস থামিয়ে হানাদারদের দিয়ে তল্লাশি চালায়। সেই যাত্রায় তাজুল ও জহির বেঁচে গেলেও অচেনা একজন যুবককে আটকে রাখে ওরা। ভারতের শ্রীনগর পৌঁছার পর দেখা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠস্বর ছাত্রলীগ নেতা রাখাল চন্দ্র বণিকের সাথে। তিনি তাজুলের আগে থেকে চেনাজানা। রাখাল বণিক তাদেরকে একটি স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, শ্রীনগর ইয়ুথ ক্যাম্পে যেতে। একটু খাটো হওয়ায় মে-জুন মাস পুরোটা কিশোর তাজুলকে বসে থাকতে হয় ক্যাম্পে। প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরে হরিণা ইয়ুথ ক্যাম্পে মিরসরাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জিতেন্দ্র প্রসাদ নাথ মন্টু, কেফায়েত উল্ল্যাহ চেয়ারম্যান ও নাজমুল হুদার সহযোগিতায় যোগ দেন প্রশিক্ষণে। সেখানকার আর্মি ক্যাম্পে ৮৫ জনের একটি গ্রুপ ২০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে সুজাউল হক কমান্ডারের নেতৃত্বে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। অবস্থান নেন মিরসরাইয়ের ইছাখালী ইউনিয়নের মাদবারহাট মাদরাসায়। নভেম্বরের প্রথম দিকে আওয়ামী লীগ নেতা সিএনসি জাফরের নেতৃত্বে দেড় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা আক্রমণ করেন জোরারগঞ্জ এলাকায় হানাদারদের ক্যাম্প। সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘দিনের সূর্য ফুটতেই চারদিক থেকে গুলিবর্ষণ করে শত্রুদের ক্যাম্পের তাঁবুর অনেকটা কাছে ঢুকে পড়েছিলাম আমরা। প্রায় এক ঘণ্টা চলে যুদ্ধ। এক পর্যায়ে গোলাবারুদের অভাবে পিছু হটতে বাধ্য হই। তবে সেই যুদ্ধে বেশ কয়েকজন হানাদার মারা যায়। পাশাপাশি কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও আহত হন।’ মিরসরাইয়ের ঝুলনপুল এলাকায় নকশালপন্থী মুক্তিযোদ্ধা নামধারী কাশেম রাজা এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের অত্যাচারের বর্ণনা দিয়ে এই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘কাশেম ছিল মুক্তিযোদ্ধা নামধারী একজন কুখ্যাত ডাকাত ও লুণ্ঠনকারী। সে মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্র ব্যবহার করে এলাকায় বাঙালিদের ঘরে ডাকাতি করত। নারীর ইজ্জত লুণ্ঠন করত। মুক্তিকামী বাঙালিদের ধরে নিয়ে ঝুলনপুল এলাকায় নির্মমভাবে খুন করত। আমরা ইছাখালীর মোহাম্মদ আলী ও চেয়ারম্যান ইউসুফের নেতৃত্বে বেশ কয়েকবার কাশেম রাজাকে হত্যা করতে গোপনে অপারেশন চালিয়েছিলাম। কিন্তু তাকে পাইনি। পরে অন্য সহযোদ্ধারা তাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়।’ চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক কুমিরাযুদ্ধের বর্ণনা করতে গিয়ে তাজুল বলেন, ‘৮ ডিসেম্বর মিরসরাই মুক্ত হলেও আমাদের কাছে এই খবর জানা ছিল না। আমাদের যুদ্ধাঞ্চল ছিল উপকূলীয় এলাকা। কমান্ডারের নেতৃত্বে ৮ ডিসেম্বরের পর রওনা হই কুমিরা ঘাটঘর এলাকার দিকে। কুমিরা যক্ষ্মা হাসপাতাল এলাকায় অবস্থান ছিল শত্রুদের। তাদের ওপর আক্রমণ করি। তবে ওই যুদ্ধে বেশ কয়েকজন ভারতীয় সেনা অফিসার শহীদ হন।’ জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান বলেন, ‘এদেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে সেদিন, যেদিন জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল।’ সূত্র- http://www.kalerkantho.com/home/printnews/446419/2016-12-29