বধ্যভূমি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বহু স্থান অরক্ষিত

Posted by Anwar Hossan
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.
১৯৭১ সালে মুক্তিসংগ্রামের প্রথমভাগে খান সেনাদের চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রবেশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই সীমান্তে (ফেনী নদী) অবস্থিত শুভপুর ব্রিজ। অসহযোগ আন্দোলনের শুরু থেকেই ব্রিজের এক কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত করেরহাট এলাকায় গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ। মার্চের শেষের দিকে (২৭ মার্চ) উপজেলার বড়তাকিয়া ও মিরসরাই সদরে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হিলিকপ্টার থেকে মর্টারসেল ছোঁড়ে পাকসেনারা। এতে বেশ কয়েকজন নিরস্ত্র বাঙালি শহীদ হন। মিরসরাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কবির আহম্মেদ জানান, ‘২৫ মার্চ থেকে মিরসরাইয়ের বেশ কয়েকটি স্থানে পাকিস্তানি সেনাদের আটকাতে সর্বস্তরের জনতা প্রধান প্রধান সড়কে ব্যারিকেড দেয়। ২৭ মার্চ বড়তাকিয়া ও মিরসরাই সদরে জনতার ব্যারিকেড ভাঙতে পাক সেনারা হেলিকপ্টার থেকে বৃষ্টির মতো মর্টারসেল নিক্ষেপ করে। এতে বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৪-৫ জন নিরস্ত্র বাঙালি শহীদ হন। অসংখ্য লোকজন সেলের আঘাতে রক্তাক্ত হন। তবে মার্চে পুরো সময়জুড়ে মিরসরাইতে গণহত্যার মতো কোন ঘটনা ঘটেনি’। ফেনী নদীতে অবস্থিত শুভপুর ব্রিজে অবরোধ গড়ে তোলা হয় ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে (আনুমানিক রাত ১২টা)। স্থানীয় করেরহাট ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা এ.টি.এম ইসমাঈল মিন্টু মিয়া ছিলেন এখানকার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক। ওই রাতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা, বর্তমান সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জিতেন্দ্র প্রসাদ নাথ মন্টু, শাহ্ আলম চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ নেতা মিহির চৌধুরী আসেন করেরহাটে। স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির নেতাদের ডেকে বলেন, ‘কুমিল্লা সেনা ক্যাম্প থেকে পাকিস্তানি আর্মি যেন চট্টগ্রাম অভিমুখে যেতে না পারে তার জন্য শুভপুর ব্রিজে অবরোধ সৃষ্টি করে এটি ধ্বংস করতে হবে’। গুরুত্বপূর্ণ ওই অবরোধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধা তোবারক উল্লাহ্ বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ডাকে স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে শুভপুর ব্রিজে সর্বস্তরের জনতাকে নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করি। এসময় আমার সঙ্গে ছিলেন অগ্রজ মির্জা ফিরোজ. ডা. গোফরান, ইঞ্জিনিয়ার এরফানুল হক, মাঈন উদ্দিন আহম্মেদ, আবুল কাশেম, ফিরোজ আহম্মেদ, মোশাররফ হোসেন বি.কম, অধ্যাপক ম. আবছার, আহম্মেদ হোসেনসহ আরো অনেকেই’। শুভপুর ব্রিজ ধ্বংসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তোবারক উল্লাহ বলেন, ‘২৫ মার্চ রাতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নির্দেশ পাওয়ার পর আর দেরি না করে চারদিকে মুক্তিকামী জনতাকে খবর দেওয়া হল। করেরহাট বাজারের মজুমদারের পেট্রোল পাম্প থেকে পেট্রোল, কেরোসিন আর ডিজেল সংগ্রহ করা হয়। আশপাশের বাড়ি-ঘর থেকে সংগ্রহ করা হয় শুকনো লাকড়ি। করেরহাট সিএমবি অফিস (বর্তমানে সড়ক ও জনপদ অফিস) থেকে সংগ্রহ করা হয় বিটুমিনভর্তি ড্রাম। রাত একটা কি দেড়টার দিকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনে নেতৃত্বে আমরা ২০/৩০ জন ব্রিজে প্রতিরোধ সৃষ্টির চেষ্টা চালাই। রাত যত গভীর হচ্ছিল তত মানুষের সমাগম বাড়ছিল। মোশাররফ ভাই ব্রিজের পাশের একটি খড়ের ঘর নিজের হাতে ভেঙে ব্রিজের পাটাতনে আগুন দিয়েছিলেন। পরে মুক্তিকামী জনতার উদ্দেশ্যে তিনি (মোশাররফ হোসেন) ভাষণ দেন। সে রাতে তিনি সকলকে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেন এবং শুভপুর ব্রিজ ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পরদিন ২৬ মার্চ সকাল ৭টা কি ৮টার দিকে তৎকালিন গণপরিষদ সদস্য ফেনীর খাজা আহম্মদ খবর পাঠালেন, শুভপুর ব্রিজ ধ্বংস করে তোমরা খান সেনাদের গতিরোধ কর। শুভপুর ব্রিজ সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়া এ মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘৩১ মার্চ দিবাগত রাত শেষে ভোরবেলায় পূর্ব আকাশে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিজে আক্রমণ চালানো হয়। সেদিন আমাদেরকে ব্রিজের দক্ষিণ পাশ থেকে নেতৃত্ব দেন ক্যাপ্টেন সুবেদ আলী ভূঁইয়া এবং উত্তর পাশে ছিলেন ক্যাপ্টেন আফতাবুল ইসলাম ও সুবেদার মঈন উদ্দিন। সেদিন ব্রিজ আক্রমণ করার পরপর পাহারায় থাকা পাকিস্তানি সেনারা প্রতিরোধের মুখে সকলেই বাংকারে ঢুকে পড়ে। উত্তর পাশে থাকা ৬ জন পাকিস্তানি আর্মি গ্রেনেড হামলায় মারা যায়। দক্ষিণেও মারা যায় আরো ৬/৭জন। সেখানে আমাদের একটু ভুল ধারণা ছিল। আমরা ভেবেছিলাম সকল পাকসেনারা গ্রেনেড হামলায় মারা গেছে। তখন ক্যাপ্টেন সুবেদ আলী ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে তিনজন ইপিআর সদস্য পাকিস্তানিদের বাংকারের দিকে এগিয়ে যেতেই ব্রাশফায়ার করে তারা। এতে ওই তিনজন ইপিআর সদস্য শহীদ হন। তাদের মধ্যে একজনের নাম আবুল হোসেন। অন্যদের নাম আমার মনে নেই। পরে বেঁচে থাকা ৪ পাকসেনা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পিছু হটে অলিনগরের দিকে পালিয়ে যায়। সেখানে জনতা এক পাকসেনাকে ধরে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলে’। বধ্যভূমি ও গণকবর পরিসংখ্যান মতে দেশের সবচেয়ে বেশি মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে। এখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন গ্রামে গ্রামে চলেছে নৃশংস গণহত্যা, ধর্ষণ আর অগ্নিসংযোগের ঘটনা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও দীর্ঘ। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সম্মুখ যুদ্ধে এখানকার মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেছেন। অথচ এখনো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের বধ্যভূমি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থান গুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের ১২ খ-ের দলিলেও এর ছাপ লক্ষণীয়। উপজেলার সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিটি হচ্ছে মিরসরাই রেল স্টেশন সড়কের লোহারপুল এলাকায়। স্বাধীনতার ৪১ বছরে এই বৃহত্তম বধ্যভূমি এলাকায় চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের উদ্যোগে ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। বর্তমানে দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিরসরাই রেল স্টেশনের লোহার পুল। এখানে হানাদাররা মুক্তিকামী মানুষদের ধরে এনে এই ব্রিজে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে নৃশংসভাবে হত্যা করতো। এছাড়া করেরহাটের পাহাড়িয়া লোহারপুল, করেরহাটের ফেনী নদীর পাড়, হিঙ্গুলী সেতু সংলগ্ন, হিঙ্গুলী কোর্টের পাড়, ছুটি খাঁ দিঘির পাড়, মায়ানি ইউনিয়নের সৈদালী গ্রাম, মস্তাননগর হাসপাতাল, ঝুলন পুলসহ অর্ধশতাধিক স্থানে নিরীহ মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে গণকবর দেয়া হয়। মিরসরাই রেল স্টেশন এলাকার একটি জমিতে শতাধিক লোককে একই স্থানে কবর দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ১৯৭২ সালের ৩ মে উপজেলার ২ নম্বর হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পশ্চিম হিঙ্গুলী গ্রামে জঙ্গলঘেরা একটি অন্ধকার পুকুরে ৮৩টি নরকঙ্কাল পাওয়া যায়। ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানের প্রায় ২৪০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে ফেনী নদীতে ভাসিয়ে দেয়। পরবর্তীতে ওই স্থানটিও বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। শুভপুর ব্রিজের দুই পাশে এবং ব্রিজের মাঝখানে বহু লোককে পাকবাহিনীরা হত্যা করে ফেনী নদীতে ফেলে দিত। হিঙ্গুলী ব্রিজের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন একটি বধ্যভূমি রয়েছে। এখানেও বহু লোককে হত্যা করে ফেলে রাখা হতো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাদের হাড়, মাথার খুলি পাওয়া গিয়েছিল। তথ্য মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী দেশের নিরীহ মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে একেকটি কবরে ১৫-২০ টি করে লাশ ফেলে রেখেছিল। পরবর্তীতে সরকার ওই স্থানগুলো বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করে এর যথাযথ সুরক্ষার নির্দেশ দেয়। কিন্তু দীর্ঘ ৪০ বছরেও মিরসরাইয়ে কোন বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়নি। সবগুলো বধ্যভূমি বর্তমানে বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে। মিরসরাইয়ের কাটাছরা ইউনিয়নের তেমুহানী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী প্রজন্মের ইতিহাস হিসেবে শেষ চিহ্ন হলো বধ্যভূমি। তাই বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া এখনই জরুরি’। মিরসরাই সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন বিএলএফ কমান্ডার জাফর উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী বলেন, ‘বধ্যভূমিগুলো আমাদের স্বাধীনতার স্মৃতি উপকরণ। সুতারাং এখনই এগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া একান্ত অত্যাবশ্যকীয় কাজ’। মিরসরাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার কবির আহম্মদ বলেন, ‘ বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ বরাবরে একটি তালিকা পাঠানো হয়েছে। সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হলে বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ করা যাবে। যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়ে গেছেন তাদের শেষ স্মৃতিটুকু রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব’। সূত্র- http://www.dainikpurbokone.net/229533/%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A7%83%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%B9-%E0%A6%90/