বীর মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ খুররামের স্মৃতিচারণঃ মধ্যরাতে গণহত্যা: ফুলার রোড

Posted by আরিফ রহমান
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.
. পঁচিশে মার্চ, একাত্তর। দিনটা ছিল আজকের দিনের মতোই উজ্জ্বল সুন্দর, কিন্তু রাতটা ছিল ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মতো। . আমি তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র, কেবলি ভর্তি হয়েছি। ফুলার রোডে আমাদের বাসা, আঠারো নম্বর বিল্ডিংয়ে। পাশেই ইকবাল হল, এখন যেটা সার্জেন্ট জহুরুল হক হল। . চৈত্রের সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায়। ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে আলো জ্বলে উঠেছে। এত চমৎকার ছিল সেদিনের সন্ধ্যা! পাড়ার মাঠে গোল্লাছুট খেলছিল মেয়েরা। মায়েরা দাঁড়িয়ে গল্প করছেন, কেউ কেউ বসে আছেন মাঠে। মাঠের ধারে ইউক্যালিপ্টাস গাছ। গাছের পাতায় লেবু ফুলের গন্ধ। বাতাসে ভাসছে সেই নেশা ধরানো গন্ধ। . আমি ফিরছিলাম বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে। লেখাপড়া নাই, কলেজ বন্ধ। বিশাল কড়ই গাছটার নিচে আসা মাত্রই পাড়ার আলোগুলো হঠাৎ একসঙ্গে দপ করে নিভে গেল। থমকে গেল মেয়েদের হাসি আর হৈচৈ। নেমে এলো অদ্ভুত এক নীরবতা। সেই নীরবতা আর অন্ধকারের ভিতর দেখলাম হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছেন অধ্যাপক আহমদ শরীফ। . মহিলাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, 'আপনারা বাড়ি চলে যান। আর্মি নামছে শহরে!' 'আর্মি!! আপনি কার কাছে খবর পেলেন?' 'আমার এক আত্মীয় আছে ক্যানটনমেন্টে। সে ফোন করেছিল।' ত্রস্ত শংকিত পায়ে মহিলারা বাড়ির দিকে চলে গেলেন। মেয়েরাও যে যার বাড়ি চলে গেল। স্তব্ধতার ভিতর দিয়ে এগিয়ে চললো সময়। রাত দশটা, সাড়ে দশটা, এগারোটা...। . আমাদের আঠারো নম্বর বিল্ডিংয়ের সামনে প্রতিদিন রাতে পাড়ার কুকুরটা কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে থাকে চুপচাপ। আজও সে আছে, কিন্তু চুপচাপ শুয়ে নেই, একটু পরপর উঠে দাঁড়াচ্ছে আর কুঁ-উ কুঁ-উ...ক'রে ডাকছে। করুণ সেই ডাক। . রাত এগারোটার দিকে শরীফ সাহেবের ছেলে দৌড়ে গিয়ে খবর দিল ইকবাল হলের ছাত্রদের। অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম দুপদাপ শব্দ তুলে ছুটে পালাচ্ছে ছাত্ররা। ক্যান্টিনের পাশের রাস্তা দিয়ে ছুটে তারা পুকুর পাড়ের গাছপালার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। যারা পালাতে পারলো না, যাদের যাবার কোনো জায়গা নেই, তাদের অনেকের জীবনে চৈত্রের সেই সুন্দর সন্ধ্যাই ছিল শেষ সন্ধ্যা। . রাত বারোটায় শুরু হলো গোলাগুলি। প্রথমে একটা গুলির শব্দ শুনলাম। নিলক্ষেতের দিক থেকে ভেসে এলো শব্দটা। এটা ছিল সিগন্যাল, তারপরই ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। চারপাশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে শুরু হলো অবিরাম গুলিবর্ষণ। কখনো হালকা অস্ত্রের কখনো ভারি অস্ত্রের! স্টেনগান, চাইনিজ-রাইফেল, এল.এম.জি... আর মাঝে মাঝে কামানের গম্ভীর গর্জনে কেঁপে উঠতে লাগলো সারা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। একটু পরপর সাঁ ক'রে জ্বলে উঠছিল আতশবাজির মতো উজ্জ্বল ম্যাগনেশিয়াম ফ্লেয়ার। যেন সিনেমায় দেখা যুদ্ধক্ষেত্র! . আমি তখন ড্রইংরুমের মেঝেতে শুয়ে গোলাগুলির শব্দ শুনছিলাম। ডিভানটা ছিল আমার ঘুমানোর জায়গা। সেখানেই প্রথমে শুয়েছিলাম। কিন্তু গোলাগুলির শব্দ ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠলো আর জানালার কাঁচগুলো ঝনঝন শব্দে কাঁপতে লাগলো- মনে হলো এখনি ছিটকে এসে গায়ে লাগবে। ভয়ে ডিভান ছেড়ে মেঝেতে নেমে এলাম। . একটু পরে গোলাগুলির শব্দ ছাপিয়ে ভিতর থেকে ভেসে এলো মায়ের ডাক। মা আমাকে ডাকছে উদ্বিগ্নভাবে। ড্রইংরুমের দরজা খুলে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলাম বারান্দায়। দরজা খুলতেই গোলাগুলির শব্দ কয়েকগুণ বেড়ে গেল। প্রচন্ড শব্দে কান পাতা দায়। একটা ম্যাগনেশিয়াম ফ্লেয়ার ফস্ করে উঠে গেল অনেক উঁচুতে, জ্বলে উঠলো দপ করে, উজ্জ্বল নীল আলোয় ভরে গেল চারপাশ। সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে- কেমন ভয় লাগে! ইচ্ছে হয় উঠে দৌড় মারি। কিন্তু সাহসে কুলায় না। মনে হয় যে কোনো সময় একটা গুলি এসে লেগে যেতে পারে গায়ে। হামাগুড়ি দিয়েই বারান্দাটা পার হয়ে বেডরুমের দিকে গেলাম। বেডরুমের মেঝেতে তোষক পাতা। বাবা-মা ভাইবোন সবাই সেখানে। ঘরের কোণায় টিমটিম করে জ্বলছে হারিকেন। আমার ছোটভাই সেলিমের বয়স বারো। ওর একটু পরপর খিদে পায়। ও নাবিস্কো বিস্কুট খাচ্ছে। আমি ঘরে ঢুকতেই আমার দিকে প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বললো, 'দাদা বিস্কুট খাও।' মা দরজাটা বন্ধ করে দিল। বাইরে তখন হত্যা, মৃত্যু আর নরকের তান্ডব শুরু হয়ে গেছে। . সারারাত গোলাগুলি চললো। কখনো কম কখনো বেশি। শেষরাতের দিকে উত্তেজনা একটু থিতিয়ে এসেছে, ঘুমও পাচ্ছে একটু একটু। এমন সময় বস্তির দিক থেকে ভেসে এলো হাজার হাজার মানুষের চিৎকার আর হাহাকার। ওদিকটাতে গুলির শব্দও তখন প্রবল। সাবধানে দরজা খুলে দক্ষিণের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো মা। আমিও গেলাম পিছে পিছে। . যে রাস্তাটা এখন পলাশি থেকে নীলক্ষেত হয়ে কাঁটাবনের দিকে গেছে, এই রাস্তাটা তখন ছিল রেললাইন। এর দুধারে ছিল গরীব মানুষের বস্তি। দেখলাম বস্তিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে সৈন্যরা। লাল হয়ে আছে রাতের আকাশ। পলাশি আর নীলক্ষেত- দু'দিক থেকে গুলি করে পাখির মতো মানুষ মারছে সৈন্যরা। শিশু আর নারীকন্ঠের তীক্ষ্ণ চিৎকার, বিলাপ আর আহাজারি শুনতে শুনতে আঁচলে মুখ চাপা দিল মা। ভীষণ ভয় পাওয়া গলায় ফিসফিস করে বললো, 'হায় আল্লাহ! হায় আল্লাহ!!' হঠাৎ খুব কাছেই ইকবাল হলের পুকুর পাড়ে কয়েকটা গুলির শব্দ হলো। তাড়াতাড়ি দরজাটা আবার বন্ধ করে দিল মা। . ভোরের আলো যখন কেবলি ফুটেছে, সেই সময় ঘটলো আরেকটা ঘটনা। ততক্ষণে বস্তির বাড়িগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। থেমে গেছে মানুষের আর্তনাদ আর মৃত্যু-চিৎকার। ইকবাল হলের পুকুর পাড়ে কারা যেন জোরে জোরে কথা বলছে। ভোরের আবছা আলোয় দেখা গেল কড়ই গাছের নিচে একটা মর্টার। সেখানে আট-দশজন সৈন্য। তারাই জোরে জোরে কথা বলছে বিজাতীয় ভাষায়। এমন সময় ইকবাল হলের দিক থেকে একজন ছাত্র এগিয়ে গেল তাদের দিকে। কী অসম্ভব সাহস এই ছেলের! সে কিছু একটা বলতে চাইলো সৈন্যদের। তার আগেই এক সৈন্য হাত বাড়িয়ে তার চুলের মুঠি ধরে ফেললো। অন্যেরা রাইফেলের বাট দিয়ে মারতে লাগলো তাকে। পড়ে গেল ছেলেটা। উঠে দাঁড়ালো। আবার মারলো। প্রচন্ড ব্যথায় চিৎকার দিল সে। . আমি চমকে উঠলাম- এ তো চিশতি ভাই! আইন বিভাগের ছাত্র। আমাদের সঙ্গে বাস্কেটবল খেলেন হলের কোর্টে। পার্ট-টাইম সাংবাদিকতাও করেন। একপাল হায়েনার মতো চিশতি ভাইকে ওরা ঘিরে ধরেছে। মারতে মারতে তাকে হলের দিকে নিয়ে গেল সৈন্যরা। অডিটোরিয়ামের আড়ালে চলে গেলো চিশতি ভাই। একটু পরে একটা গুলির শব্দ শুনলাম। বুঝতে পারলাম মেরে ফেললো। চিশতি ভাই হয়ে গেলেন ইকবাল হলে গণহত্যার প্রথম শহীদ। . ফুলার রোডে আর্মি ঢুকলো সকাল ন’টার দিকে। মা রান্নাঘরে নাস্তা তৈরি করছিল। হঠাৎ ছুটে এলো বড় ঘরে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে মা দেখেছে সারি সারি সৈন্য ঢুকছে আমাদের পাড়ায়। বাবা দাড়ি কাটছিল। গালে সাবান মাখা অবস্থায় এসে দাঁড়ালো জানালার পাশে। . আমরা দেখলাম সৈন্যরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেল। একদল গেল ডাইনে, একদল বাঁয়ে আর তৃতীয় দলটি সোজা এগিয়ে এলো আমাদের আঠারো নম্বর বিল্ডিংয়ের দিকে। আলগোছে জানালার পর্দা ছেড়ে দিয়ে আড়ালে সরে গেল মা। ইশারায় আমাদেরও সরে যেতে বললো। খুব কাছেই ওরা। উদ্যত অস্ত্র হাতে। জানালার পর্দা একটু নড়লেই গুলি করবে। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছি আমরা। এমন সময় গেটের দিক থেকে একটা খাকি পোশাক এই খাকি পোশাকগুলোকে ডাকলো। এরা ঘুরে সেদিকে চলে গেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আমরা। . ডানদিকে বারো নম্বর বিল্ডিংয়ের ওদিকে গিয়েছিল একটা দল। সেদিক থেকে কয়েকটা গুলির শব্দ ভেসে এলো। একটু পরে একজন মৃত মানুষকে দুটো সৈন্য মিলে ধরাধরি করে এনে রাখলো মাঠের মাঝখানে। এরপর একইভাবে নিয়ে এলো আরেকজনকে। তারপর আরেকজন। তার পর আরও একজন! এভাবে জন চারেক সদ্যমৃত মানুষকে তারা মাঠের মাঝখানে নিয়ে এসে সার দিয়ে রাখলো। . আব্বা বড়ো বড়ো চোখে অবাক গলায় বললো, 'ওরা শিক্ষকদের মারছে!' . একটা ট্রাক এসে দাঁড়ালো। মৃত মানুষগুলোকে সৈন্যরা বালুর বস্তার মতো ছুঁড়ে দিল একে একে ট্রাকের উপরে। তারপর নিয়ে চলে গেল। . ট্রাকটা যেতে না যেতেই আবার কারা যেন ঢুকলো। না সৈন্য নয়, খাকি পোশাক নয়, সাধারণ মানুষ। ওরা একটু এগিয়ে আসতেই আমি আমার বন্ধু মোমিন আর তার মা'কে চিনতে পারলাম। সঙ্গে তাদের কাজের ছেলে মান্নান। মান্নানের মাথায় একটা ট্রাংক। মা ওদের ডাক দিল। তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে হাঁপাতে লাগলো ওরা। তিনজনের চোখেমুখেই মৃত্যুভয় আর আতঙ্কের ছাপ। হাঁপাতে হাঁপাতে মোমিন বললো আমাকে এক গ্লাস পানি খাওয়া। মোমিনের বাবা মুনিম সাহেব ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এবং এস এম হলের হাউস টিউটর। ওরা থাকতো হলের কোনায় দোতলা বাড়িটাতে। . মোমিন আমাদের জানালো রাত তিনটার দিকে আর্মি ঢোকে ওদের বাড়িতে। ঢুকে বলে কে নাকি গুলি ছুঁড়েছে ওদের বাড়ি থেকে। সুতরাং বাড়ি সার্চ করবে ওরা। এই ছিল সে রাতে সৈন্যদের গৎ বাঁধা বুলি। মোমিনের বাবার শিকার করার দোনলা একটা বন্দুক ছিল। সার্চ করার সময় বন্দুকটা বেরিয়ে পড়ে। . সৈন্যরা মোমিনের বাবা, মামা আর মোমিনকে ধরে নিয়ে যায় হলের মধ্যে। মোমিনের বাবা এক সময় পশ্চিম পাকিস্তানে চাকরি করেছেন। সে কারণে মোমিনের মা ভালো উর্দু বলতে পারতেন। তিনি সৈন্যদের বুঝানোর চেষ্টা করলেন যে, এই বাড়ি থেকে কেউ গুলি ছোঁড়েনি, এটা একজন শিক্ষকের বাড়ি, তারা নিরীহ নিরপরাধ মানুষ। কথাবার্তার ফাঁকে একজন বালুচ সৈন্য পানি খেতে চাইলে মোমিনের মা তাকে কয়েকটা বিস্কুট এবং এক গ্লাস পানি খেতে দেন। . সৈন্যরা যখন মোমিনদের ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, মোমিন দেখতে পায় হলের মধ্যে আগুন জ্বলছে। আর সৈন্যরা রুমে রুমে ঢুকে ছাত্রদের খুঁজছে। যাকে পাচ্ছে তাকেই গুলি করে দোতলার গরাদবিহীন জানালা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে নিচে। মোমিনদের তিনজনকে হলের গেটের পাশে দারোয়ানের ছোট্ট ঘরে নিয়ে আটকে রাখে সৈন্যরা। দরজায় তালা মেরে চলে যায়। এদিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে চারপাশে। একটু পরে দুজন সৈন্য এসে তালা খুলে তাদের বের হতে বলে। সৈন্যদের একজন মোমিনকে বলে 'তুম ভাগ্ যাও।' এই বলে ওর বাবা আর মামাকে নিয়ে চলে যায়। . মোমিন দৌড়ে বাসায় ফিরে আসে। তারপর সকাল হলে ট্রাংকের মধ্যে দুচারটা দরকারি জিনিস ভরে এক কাপড়ে চলে আসে আমাদের পাড়ায়। মোমিনের আম্মা ফিসফিস করে আমার মাকে বললেন 'ভাগ্যিস মেয়েগুলোকে আগেই গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। নাহলে আজকে কি হতো কে জানে!' . সারাদিন আতংকের মধ্যে কাটলো। রেডিও পাকিস্তান থেকে ঘোষণা করা হয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ। কেউ বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে না। বেরোলেই গুলি। ছয় ব্যাটারির একটা রেডিও ছিল আমাদের বাসায়। বাড়ি মেরে মেরে ওটাকে চালু রাখতে হয়। ওটার সঙ্গে কান লাগিয়ে বসে আছি আমরা সবাই। কখন কি ঘোষণা হয়! মোমিন রেডিও শুনছে না, ও নিঃশব্দে কাঁদছে। ওর চোখের সামনে দিয়েই সৈন্যরা ওর বাবা আর মামাকে খোলা মাঠের দিকে নিয়ে গেছে গুলি করে মারার জন্য। . একটু পরে আমি আর মোমিন দক্ষিণের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। একটা কাকও ডাকছে না সকাল থেকে। পাখিরা উধাও। চারপাশে দিনের আলো কিন্তু ভুতুড়ে এক নীরবতা। সামনের বিল্ডিংয়ের দোতলায় বছর দশেকের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ওটা অবাঙালী শিক্ষক ডক্টর নাকভীর বাড়ি। বাড়িঘর ছেড়ে তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন। কাজের ছেলেটাকে রেখে গেছেন। ইকবাল হলে সৈন্যরা ঘাঁটি গেড়েছে। হঠাৎ সেদিক থেকে একটা গুলির শব্দ এলো। গুলিটা এসে লাগলো ছেলটার বুক বরাবর রেলিঙের গায়ে। ছিটকে উঠলো সিমেন্ট। ভয়ে উল্টে পড়লো ছেলেটা। পরমুহুর্তেই 'ওরে বাবারে!' বলে লাফিয়ে উঠে দৌড়ে পালালো ঘরের ভিতর। . দৃশ্যটা দেখে হাসি পেল, কিন্তু হাসতে নিয়েও হাসতে পারলাম না আমি। বুঝলাম টার্গেট প্র্যাকটিস করছে সৈন্যরা! বুলেটটা আর ইঞ্চি তিনেক উপর দিয়ে এলেই ছেলেটার মাথা গুঁড়িয়ে দিয়ে চলে যেত! কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি হলো মেরুদন্ডে। যে কোনো সময় এদিকেও আসতে পারে একটা বুলেট। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে গেলাম আমি আর মোমিন। . দুপুরের দিকে খটখট করে নড়ে উঠলো দরজার কড়া। খুলে দেখি মোমিনের আব্বা! তাঁকে মারেনি সৈন্যরা, দয়া করে ছেড়ে দিয়েছে। তিনি ঘরে ঢুকেই আগে নামাজ পড়লেন। দোয়া শেষ হলে একটা মাত্র কথা বের হলো তাঁর মুখ দিয়ে 'মুন্সিকে নিয়ে গেছে।' মুন্সি হচ্ছে মোমিনের মামা। . সে রাতটাও গেল আতংকের মধ্যে দিয়ে। ভাঙা ভাঙা ঘুম আর দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কেটে গেল আরেকটা রাত। সকালে যে জিনিসটা আমি প্রথম লক্ষ্য করলাম- আব্বার মাথার চুল অনেকগুলো সাদা হয়ে গেছে। এক রাতেই যে মানুষের বয়স এমন বেড়ে যেতে পারে আব্বাকে না দেখলে আমি জানতে পারতাম না। . সাতাশে মার্চ সকালে রেডিওতে বললো কারফিউ তুলে নেয়া হয়েছে কিছু সময়ের জন্য। আমি আর মোমিন মুন্সি মামাকে খুঁজতে বের হলাম। প্রথমে গেলাম হলের দিকে। বাস্কেটবল কোর্টের পাশে একটা জটলা। সেদিকে গিয়ে দেখি সাত আটটা মৃতদেহ। গুলির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। মৃতদেহগুলোর মধ্যে মোমিন তার মামাকে খুঁজতে লাগলো। কিন্তু তাকে সেখানে পাওয়া গেল না। আমরা গেলাম হলের প্রধান গেটের দিকে। চিশতি ভাইয়ের কথা মনে পড়লো। তাকে মারতে মারতে এদিকেই নিয়ে এসেছিল সৈন্যরা। পাম্পঘরের পাশে কয়েকটা পোড়া মৃতদেহ। তার মধ্যে চিশতি ভাইকে খুঁজলাম, কিন্তু চেনার কোনো উপায় নাই। মুখগুলো পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মোমিন আমার হাত ধরে টান দিল। . আমরা এবারে গেলাম আরও দূরে নীলক্ষেতের দিকে। রাস্তাটা পার হয়েই হাতের বাঁয়ে পেট্রোল পাম্প। সেখানে একটা লোক শুয়ে আছে। কাঁচ ঘেরা ঘরের মধ্যে লোকটাকে দেখাচ্ছে মমির মতো। তার বুকের কাছে বুলেটের চিহ্ন লাল হয়ে আছে। মেঝেতে খানিকটা রক্ত গড়িয়ে পড়েছে। কাঁচের দেয়ালে দেখলাম একটা ফুটো- এদিক দিয়েই গুলিটা ঢুকেছে। . মোমিন বললো 'চল্ ফিরে যাই। আর খোঁজার দরকার নাই।' ফেরার পথে জটলা দেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসের পেছনটা ঘুরে গেলাম। দালানের পেছনে চাতালে চার পাঁচজনের একটি পরিবার। গৃহহীন নিঃস্ব পরিবার- বাবা মা ছেলে মেয়ে। রাতে এখানে আশ্রয় নিয়েছিল। এখন তাদের গুলিবিদ্ধ দেহগুলো পড়ে আছে। দৌড়াতে দৌড়াতে বাসায় ফিরলাম আমি আর মোমিন। . এদিকে তখন বাধাছাঁদা চলছে। একটা টিনের মধ্যে আটা আর বস্তায় চাল নেয়া হয়েছে। ট্রাঙ্কের মধ্যে কাপড় গোছাচ্ছে মা। পুরানা পল্টনে থাকেন আমাদের এক মামা। রক্তের সম্পর্ক কিছু নাই। কিন্তু রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গাঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে মানুষে মানুষে। তেমনি এক মামা এসেছেন আমাদের খোঁজ নিতে এই দারুণ দুঃসময়ে। আমরা তাঁকে ডাকি বড়মামা। . তিনি আমাদের পৌঁছে দেবেন তাঁর ফোক্সওয়াগন গাড়িতে, যেখানে আমরা যেতে চাই সেখানে। চালের বস্তা, আটার টিন, ট্রাংক- সব তোলা হয়েছে গাড়িতে। সবাই রেডি। মা-বাবা দরজায় তালা দিয়ে নেমে এলেই রওনা দেব আমরা। সময় নাই। ঘন্টা দুয়েক পরেই আবার শুরু হবে কারফিউ। আবার গুলি, আবার হত্যা। তার আগেই পালাতে হবে এই হত্যাপুরী ছেড়ে। কিন্তু কোথায় যাবো আমরা, কোথায় পালাবো? কোথায় আছে নিরাপদ আশ্রয়? মা বললো 'আগে এখান থেকে বের হই। তারপর ভাবা যাবে।' . গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে, এমন সময় দেখা গেল দূর থেকে একটা লোক ছুটে আসছে। তার কাপড়-চোপড় ছেঁড়া, চুল উস্কোখুস্ক। পাগলের মতো দেখাচ্ছে তাকে। দু'হাতে বুক চাপড়াচ্ছে লোকটা আর চিৎকার করছে 'আমার বোন কই! আমার বোন কই!!' . গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামলো মোমিন। চিৎকার দিয়ে ডাকলো 'মুন্সি মামা! মুন্সি মামা!!' . মুন্সি মামা ছুটে এলেন আমাদের দিকে। তাকে হত্যা করার দায়িত্ব পড়েছিল বালুচ সৈন্যটার উপর, যাকে পানি খেতে দিয়েছিলেন মোমিনের আম্মা। মুন্সি মামাকে মারেনি সৈন্যটা। বলেছে 'তুমি পালাও। আমি গুলি ছুঁড়বো, কিন্তু তোমার গায়ে লাগাবো না। পালাও।' মুন্সি মামা পালিয়ে একটা ড্রেনের মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন একদিন দুইরাত। . মোমিনরা তাদের মতো চলে গেল। মুন্সি মামার গল্প শুনে সবাই কেমন থম মেরে আছে। মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বড়মামাকে বললো 'ভাই, গাড়ি ছাড়েন।' . গাড়ি ছুটে চললো অজানার উদ্দেশ্যে। (বীর মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ খুররামের স্মৃতিচারণ, তাঁর ফেসবুক দেয়াল থেকে)