বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনের ভূমিকা বাংলা

Posted by আরিফ রহমান
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.
দেশের মুক্তিযুদ্ধে বহির্বিশ্বের যেসব শক্তি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত ছিল চীন তাদের অন্যতম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে চীনের সরকারি অবস্থান ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। বাংলাদেশের সংকট নিয়ে চীনের প্রথম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয় ১১ এপ্রিল ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি চৌ এন লাই এর চিঠির মাধ্যমে। ঐ চিঠিতে চৌ এন লাই পাকিস্তানের ঘটনাবলীকে সে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে জানান এবং জনগণ বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়াই তা সামাধান করবে বলে উল্লেখ করেন। এমনকি পাকিস্তানের জাতীয় স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীনের দ্ব্যর্থহীন সমর্থনের কথাও তিনি জানিয়েছিলেন। অবশ্য চিঠিতে তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধি কোনো বক্তব্য রাখেননি। তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে চীন বাঙালির সংগ্রাম ও নির্যাতনের প্রতি ও কোনো সহানুভূতি দেখায়নি। বরং পাক সামরিক চক্রের প্রতি জানিয়েছিল আকুণ্ঠ সমর্থন। এমনকি চীনপন্থী রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত মওলানা ভাসানীর আকুল আবেদন সত্ত্বেও চীনা নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ শুরুর পূর্ব পর্যন্ত চীন পাকিস্তানপন্থী থাকলেও মোটামুটিভাবে বাঙালির সংগ্রাম বিরোধি কোনো মন্তব্য করেনি। এমনকি এপ্রিল হতে অক্টোবর পর্যন্ত চীন প্রকাশ্যে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে গোপনে যে পাকিস্তানের সামরিক চক্রকে নৈতিক শক্তি ও সাহস যুগিয়েছিল এবং সরাসরি সামরিক উপকরণ সরবরাহ করেছিল। ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত-সোভিয়েত চুক্তি স্বাক্ষরের পর চীনের পাকিস্তানপন্থী নীতি আরো প্রকট হয়ে ওঠে। সেপ্টেম্বর মাসে চীন পাকিস্তানকে এই বলে আশ্বস্ত করে যে, জাতীয় স্বার্থরক্ষায় চীন পাকিস্তানকে সাহায্য করবে। তখনও পর্যন্ত চীনের বক্তব্যে বাঙালি বিরোধি তেমন বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। এজন্য প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার অনেক সময় আশা করতেন যে শেষ পর্যন্ত হয়তো চীন সংগ্রামী বাঙালির পক্ষে দাঁড়াবে। কিন্তু সে আশা সফল হয়নি। ৫ নভেম্বর চীনাদের আস্থাভাজন ভুট্টোর নেতৃত্বে একটি পাক প্রতিনিধি দল চীন সফরে যায়। চীন থেকে অতিরিক্ত অঙ্গীকার বা সাহায্য পাওয়ার আশায়। কিন্তু চীনের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রী (ভারপ্রাপ্ত) বি পেঙ ফী পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধান খুঁজে বের করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল। বাঙালি বিরোধি বক্তব্য না রাখলেও পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্ত দিয়ে চীন নিয়মিতভাবে পাকিস্তানকে সমরাস্ত্র পাঠাতো। এছাড়াও গেরিলা যুদ্ধে প্রশিক্ষণ দানের জন্য চীন অক্টোবর মাসে টাকায় ২০০ (দু’শ) সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছিল। উল্লেখ্য যে, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর হতে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান মোট ২০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের চীনা সামরিক উপকরণ সাহায্য হিসেবে পেয়েছে যার মধ্যে ১৯৭১ সালেই সরবরাহ করেছিল ৪৫ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র। আর চীনের রাইফেল ও অন্যান্য উন্নত সমরাস্ত্র দিয়েই পাকবাহিনী নির্বিচারে হত্যা করেছে বাঙালিকে। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতে পূর্বাঞ্চলে সামরিক হামলা চালালে শুরু হয় সরাসরি পাক-ভারত যুদ্ধ। এ সময় হতে চীন জাতিসংঘে সরাসরি বাঙালি বিরোধি ভূমিকা পালন করতে থাকে। পাক-ভারত যুদ্ধের জন্য চীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে দায়ি করে। যুদ্ধ বিরতির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা এবং পাকবাহিনীর বর্বরতার ফলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার লক্ষ্যে ৫ ও ৭ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘে দুটি প্রস্তাব উপস্থাপন করে। কিন্তু প্রস্তাব দুটোর বিরুদ্ধে চীন প্রথম ভেটো প্রয়োগ করে এবং চীনের নিজস্ব প্রস্তাবে ভারতকে আগ্রাসী পক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, চীন জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের মাত্র ৪০ দিনের মাথায় নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন লাভের পর প্রথম প্রস্তাবেই ভেটো প্রয়োগ করেছিল। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করলে চীন এক বিবৃতিতে ‘তথাকথিত’ বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের তীব্র সমালোচনা করেন। স্বাধীন বাংলাদেশকে তথাকথিত বাংলাদেশ বলে অভিহিত করে চীন চরম অবহেলা করেছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। সুত্রঃ http://www.dainikpurbokone.net/79488/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7-2/