বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা

Posted by আরিফ রহমান
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.
লিক দিক দিয়ে চীনের মতো সোভিয়েত ইউনিয়নও দক্ষিণ এশিয়ার নিকটতম একটি পরাশক্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হতেই ইউরোপীয় পরিম-ল ছাড়িয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং একটি নতুন পরাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। মধ্য ষাটের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেকে একই সঙ্গে ইউরোপীয় ও এশীয় শক্তি হিসেবে দাবী করে। তবে ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম দক্ষিণ এশীয় ভূ-খ-ে বিশেষ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই কূটনৈতিক প্রয়াসের পেছনে মৌল ভিত্তিই হলো এই যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন বাইরের পৃথিবীকে জানাতে চেয়েছিল যে ভৌগলিক নৈকট্যের কারণে দক্ষিণ এশিয়া তার প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভূক্ত এলাকা। এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, ষাটের দশকে আমেরিকা যতই ভিয়েতনাম সমস্যায় গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ততই দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠেছিল। কিন্তু সত্তর দশকের শুরুতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন-এ দু’পরাশক্তির মধ্যে ¯œায়ুযুদ্ধের তীব্রতা যেমন হ্রাস পেতে থাকে। তেমনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এমনি প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সুতরাং চীন, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশাপাশি আমেরিকাও এ যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল। তবে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নই প্রথম বাঙালি গণহত্যাকে নিন্দা জানায়। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই মনে করা হয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন আগাগোড়াই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা রেখেছিল। ষাটের দশকে পাকিস্তান চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সমানভাবে উন্নত সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিল। কিন্তু রুশ-চীন বিবাদের ফলে তা সম্ভব হয়নি। ১৯৬৯-এর দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন দক্ষিণ এশিয়া নিরাপত্তা জোটে সরাসরি অংশগ্রহনের জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু এ জোটটি চীন চীন বিরোধি হওয়ায় পাকিস্তান জোটে যোগদানে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে পাকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের সহানুভূতি হারায়। অন্যদিকে পাকিস্তানের মাধ্যমেই চীন-আমেরিকা সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ায় পাকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরাগভাজন হয়। সুতরাং ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন মস্কো-ইসলামাবাদ সম্পর্কের বেশ অবনতি ঘটেছিল। এমনি সময় মস্কো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রথমে সতর্কতামূলক অবস্থান গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে বাংলাদেশ এ যুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত নীতির শেষ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে ৩ ডিসেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ শুরুর সময় হতে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত সময়কালকে। এ সময়ে তিন পরাশক্তির বিভিন্নমুখী তৎপরতা সারা বিশ্বে সংবাদ শিরোনাম হয়। পাকিস্তান ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণভাবে বাংলাদেশ সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টিতে এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় হলো শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়া। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র বা চীন উত্থাপিত যে কোনো যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিতে শুরু করে। ভেটো দেয়ার সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের বক্তব্য ছিল যে, যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব গ্রহণের সময়ে এটাও নীতিগতভাবে মেনে নিতে হবে যে, বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের ব্যাপারে বাঙালিদের মতামতই চূড়ান্ত। অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন কৌশলে যুদ্ধ বিরতি বিলম্ব করছিল। কারণ ভারতীয়বাহিনী যাতে সামরিক বিজয়ের প্রয়োজনীয় সময় পায়। পরিস্থিতির কারণেই যেসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ ভারতের বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাদের লক্ষ অর্জন করতে চাইছিল। তাই ভারতীয়বাহিনী ঢাকা দখল করার আগ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন যে কোনো যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ভেটো দিয়ে আসছিল। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মাসমর্পণের মাধ্যমে ২১ ডিসেম্বর যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাব পাশ হয় এতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর ভেটো প্রয়োগ করেনি। সূত্রঃ http://www.dainikpurbokone.net/78995/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A7%87/