বিস্মৃত নক্ষত্রঃ মিরসরাইয়ের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল মোস্তফা

Posted by Anwar Hossan
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.
কবিতা গান আর বাঁশির সুর ভালোবেসে কেটেছে তাঁর কৈশোর। যৌবনের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানী শাসক শ্রেণীর শোষণ-বঞ্চনা আর নীপিড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদি হয়ে ওঠেন সিরাজুল মোস্তফা। কলেজের প্রথম বর্ষে পড়াশুনাকালে শুরু হয় ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যূত্থান। সেসময় বাড়ির আঙ্গিনায় ঘরের পুরানো কাপড় আর খড়কুড়ো দিয়ে বানানো শোষকদের কুশপুত্তলিকায় আগুন ধরিয়ে প্রতিকী প্রতিবাদ জানাতেন পাকিস্তানী দুঃশাসনের। সঙ্গে রাখতেন ছোট বোন হেলেনা আক্তারকে। মা আর বড় বোন শাহেদা খানমের বকুনি খেয়েও থেমে থাকেননি। পাড়ার বন্ধুদের যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি নিতে বলতেন। কলেজে সবার কাছে সিরাজুল ছিল প্রিয়। বরাবরের মত মেধাবী সিরাজুল বাঁশের একটি বাঁশি যার সার্বক্ষণিক সঙ্গে থাকতো। মুক্তিযুদ্ধের দুই বছর আগে থেকে বাঁশিতে প্রতিবাদের সুর তুলতেন। সেসময়কার প্রচলিত স্লোগানের পাশাপাশি নিজেও রচনা করতেন কবিতা, স্লোগান আর গান। সে বাঁশের বাঁশির সুর হঠাৎ থেমে যায় পাকিস্তানীদের বুলেটের আঘাতে। দিনটি ছিল ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সাল। ‘বাংলা মায়ের মুক্তির লাগি রক্ত লাগলে দিবো গো, দালাল গোষ্ঠী হালাল করে স্বর্গে মোরা যাবো গো।’ এটি সিরাজুলের নিজের লেখা একটি কবিতার পংক্তি বলে জানায় তাঁর বোন হেলেনা আক্তার। এমন অসংখ্য কবিতাকে সুর দিয়ে নিজের বাঁশিতে বাজাতেন। সহযোদ্ধাদের মনে সাহস যোগাতেন মুক্তিযুদ্ধের সময়। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল সম্পর্কে কথা হয় তাঁর সহপাঠী ও রনাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ আব্দুল্লাহ্ হারুণের সাথে। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধে সিরাজুলের কোমল হাতে ওঠে আসে অস্ত্র। অসীম সাহস আর বীরত্বের সাথে লড়ে গেছেন পাকিস্তানী জান্তা আর এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে। অস্ত্র বুলেট আর বারুদের গন্ধে নিজের প্রিয় বাঁশিটির কথা কখনো ভোলেন নি। সময় পেলেই সহযোদ্ধাদের সাহস আর মনোবল জোগাতে বাঁশিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানের সুর তুলতেন। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষনের পর সহযোদ্ধা ইউসুপ আব্দুল্লাহ্ হারুণ, ভগ্নীপতি সাবের আহম্মদ সবুজ ও কমান্ডার এফ এম নিজাম এক সাথে ভারতে যান ট্রেনিং নিতে। ভারতের হরিণা ক্যাম্পে ট্রেণিং শেষে ফিরে এসে যোগ দেন ১ নম্বর সেক্টরে। শুরু হয় যুদ্ধ, কমান্ডার এফএম নিজামের কমান্ডে থেকে বীরত্বের সাথে লড়ে যান সিরাজুল। অপারেশন শেষে প্রতিদিন রাতে অবস্থান করতেন মিরসরাইয়ের আবুতোরাব বাজার সংলগ্ন বাণিয়া বাড়িতে (মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী ক্যাম্প)। হঠাৎ একদিন সহপাঠী বন্ধুদের দেখতে মন ছটফট করছিল তাঁর। সহযোদ্ধা হারুণ বেশ বারন করলেও ছুটে যান মিঠাছরা এলাকার জোড়পূনী গ্রামের কাদির বক্স ভূঁইয়া বাড়িতে। সেখানে আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা স্থানীয় রাজাকার, আল শামস ও আল বদর সদস্যরা খবর দিয়ে দেয় পাকিস্তানী হানাদারদের। তারা বাড়ি একটু দূরে নিয়ে তাকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। পাকিস্তানীদের গুলিতে সিরাজুলের নিহত হওয়ার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তিযোদ্ধা হারুণের ছোট ভাই কামরুল ইসলাম জানান, ওইদিন একটি জলপাই রঙ্গের জীপ এসে পুরো বাড়ি তল্লাশি শুরু করে। প্রথম তল্লাশির সময় পাকিস্তানীরা সিরাজুলকে খুঁজে পায়নি। তিনি বাড়ির মহিলাদের সাথে বোরকা পড়ে লুকিয়ে ছিলেন। পরক্ষণে ওই বাড়ির (কাদির বক্স ভূইয়া) একজন রাজাকার সদস্য পাকি শকুন'দের বাতলিয়ে দেয় ‘সিরাজুল মহিলাদের মধ্যেই আছে।’ ওই রাজাকারের পরামর্শ মত ঠিকই সিরাজুলকে ধরে ফেললো পাকিস্তানীরা। ধরে নিয়ে বাড়ির অদূরে মিঠাছরা গ্রামের কামার বাড়ি রাস্তায় কালো কাপড় দিয়ে চোখ আর হাত বেঁধে চারদিক থেকে গুলি করে পাকিস্তানীরা। এলাকায় কথিত আছে, পাকিস্তানীদের স্টেনগানের উপর্যপরি গুলি খেয়েও সিরাজুল ‘জয় বাংলা’ বলে আবার উঠে দাঁড়াতেন, এভাবে তিনবার দাঁড়িয়ে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে শেষে নুয়ে পড়েন মাটিতে। এভাবেই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বগাঁথা শেষ হয় জীবন দিয়ে। সেদিন ছিল ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সাল। সেইদিন থেকে আর বাজেনি সিরাজুলের বাঁশের বাঁশি। মিরসরাইয়ের মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান জানান, সিরাজুলের মৃত্যুর পর তাঁর মায়ের আর্তনাদ আহাজারীতে ভারী হয়ে উঠেছিল গ্রামের আকাশ-বাতাস। কয়দিন না যেতেই সিরাজুলের মা জাহানারা বেগম ছেলে হারানো শোকে পাগল হয়ে যান। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তায় রাস্তায় শুধু ছেলেকে খুঁজতেন। পথে কাউকে দেখলে জিজ্ঞেস করতেন ‘তোমরা আমার ছেলেকে দেখেছ ?’ গ্রামের লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের ২০ বছর পর সিরাজুলের মা জাহানারা বেগম মারা যান। সিরাজুল ছোট থাকতেই মারা যায় তাঁর বাবা জয়নাল আবেদীন চৌধুরী। দুই বোন হেলেনা আক্তার ও শাহেদা খানম থাকেন স্বামীর বাড়িতে। মিরসরাই উপজেলার ১১ নম্বর মঘাদিয়া ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামের পাগলাওলী চৌধুরী বাড়িতে সিরাজুলের শূন্য ভিটে জুড়ে এখনো হাহাকারে চিহ্ন। শহীদ সিরাজুল মোস্তফার ছোট বোন হেলেনা আক্তার বলেন, ‘১৯৬৯ সাল থেকে ভাইয়ার (সিরাজুল মোস্তফা) মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কাজ করছিলো। আমাদের ঘরের পুরানো কাপড় দিয়ে ইয়াহিয়াসহ অনেক পাকিস্তানী শাষকদের কুশপুত্তলিকা বানিয়ে বাড়ির সামনে আগুন দিয়ে পোড়াতো আর লাঠি দিয়ে তাদের আঘাত করতো। মুক্তিযুদ্ধের অনেকগুলো কবিতা লিখেছিলেন ভাইয়া। ডায়েরীগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।’ শহীদ সিরাজুলের সহযোদ্ধা ও সহপাঠী মুক্তিযোদ্ধা ইউসুপ আব্দুল্লা হারুণ বলেন, ‘খুব সাহসী একজন যোদ্ধা ছিল সিরাজুল মোস্তফা। দেশ স্বাধীন হলে এদেশের মানুষ দু’মুঠো ভাতের অভাবে মরবেনা, পাকিস্তানীদের গোলামী করতে হবে না এবং বাংলাদেশ পৃথিবীর কাছে নিজের আপন পরিচয় দিতে পারবে। এমনটি স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু রাজাকারদের ভয়ংকর আক্রোশে সিরাজুলকে নিজের রক্ত দিতে হল। স্বাধীন বাংলাদেশের মুখ সে দেখলো না।’ এসময় আক্ষেপ করে শহীদ সিরাজুলের ছোট বোন হেলেনা আক্তার বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমার ভাই রক্ত দিয়েছে এদেশের স্বাধীনতার জন্য কিন্তু আমার ভাইয়ের স্মৃতি রক্ষায় কোন উদ্যোগ নেয়া নেয়নি।’ এছাড়া সিরাজুলের বোন হেলেনা যেসকল রাজাকার -আলবদর ও আল সামস সদস্যরা তাঁর ভাইকে পাকিস্তানীদের হাতে তুলে দিয়েছিল তাদের অনেকে এখনো বেঁচে আছে বলে জানিয়েছে। তাদের বিচার কবে হবে? কৃতজ্ঞতাঃ Guerrilla 1971 পেজ।