মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মজলুম জননেতা মাওলানা আজমী

Posted by Anwar Hossan
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.
ননী গোপাল সাহা: মাওলানা আহমেদুর রহমান আজমী জন্মগ্রহণ করেন সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তঁর জন্ম ১৯২৮ সালের ২ নভেম্বর তিনি মাদ্রাসা শিক্ষায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তাঁর বাবা ইসলাম ধর্ম ও আল-কোরআন বিষয়ে বিশিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। গ্রামের আলো হাওয়ায় তিনি মানুষ হয়েছিলেন, তাই গ্রামজীবনের সাথে তার সম্পর্ক শেকড়লগ্নতার অনুরূপ। গ্রামের প্রান্তিকজন, কৃষক সমাজ তাই তার আপনজন। নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন রাজনৈতিক আন্দোলনে ষাটের দশকটি ছিল আমাদের জাতীয় জীবনের বিশেষ করে আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে এক অন্য রকম সময়। এখন যারা রাজনীতি করেন বা রাজনীতি সচেতন তাঁদের বোঝানো কঠিন সেই দশকটি সম্পর্কে। একদিকে ফিল্ড মাশাল মোহাম্মদ আইয়ুব খানের কঠোর সামরিক শাসন, অন্যদিকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের জন্য সংগ্রাম। একই সঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শোষণমুক্ত সমাজের লক্ষে বামপন্থী ছাত্র যুব সমাজের আন্দোলন। বাম সামাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল ন্যাপ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কাছে। ষাটের দশকের বাম ধারার ছাত্র যুব নেতাদের মধ্যে যারা সাধারণ মানুষের আন্দোলনকে জীবনের ঝুকি নিয়ে সংঘঠিত করেছেন তাদের মধ্যে মাওলানা আজমী একজন নিবেদিতপ্রাণ। আইয়ুবের জেল জুলুম নিষ্ঠুর নির্যাতন মাওলানা আজমীকে তার লক্ষ্য থেকে নিবৃত্ত করতে পারে নাই। মাওলানা আজমী এখানে ব্যতিক্রম ধরনের মানুষ ছিলেন। তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেছিলেন যার যার ধর্ম তার তার, মেহনতী মানুষ এক কাতার। তিনি চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করেন। সত্যিকারে অসামপ্রদায়িক প্রগতিশীল বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে সাথে গরিব-দুঃখী মেহনতী মানুষের মুক্তির মশাল হাতে তুলে নিলেন। পাকিস্তান আমলের অধিকাংশ সময় মাওলানা আজমীকে হুলিয়া মাথায় নিয়ে দিন অতিবাহিত করতে হয়েছে। কখনো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন নি। হাসিখুশি প্রাণোজ্জ্বল এই বিপ্লবী মানুষটি পারিবারিক গণ্ডিতে একেবারে ভিন্ন মানুষ। সত্যিকারের মজলুম জননেতা। তার নিজের বলতে কিছুই ছিল না। আপামর জনগণের ভাগ্যকেই নিজের ভাগ্য বলে মনে করতেন। তিনি কখনো নিজের জন্য কিছু চাননি। একজন লুঙ্গিপড়া সাধারণ মানুষ কিন্তু যখন রাজনৈতিক মঞ্চে তিনি বক্তব্য দিতেন বা পার্টির নীতিনির্ধারণী সভায় বক্তব্য দিতেন তখন মনে হতো একজন রয়েল বেঙ্গল টাইগার। অত্যন্ত সুবক্তা ছিলেন, সত্যিকারের জননেতা। নীতির ক্ষেত্রে মাওলানা আজমী একনিষ্ঠ ছিলেন। সকল প্রকার লোভ, লালসা, মোহমুক্ত ও নিরঅহংকারী একজন নির্ভোজাল বিপ্লবী ছিলেন। ১৯৭০-১৯৭৩ সালে আমার নিজের পক্ষে তার সংসদ নির্বাচন করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি নিজের জন্য কখনো মানুষের নিকট ভোট প্রার্থনা করতেন না। এই লুঙ্গি পড়া লোকটি মহাপুরুষদের ন্যায় অত্যন্ত উচ্চমানের ব্যক্তিত্ব মানসিকতার ও উন্নত মনের চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। ১৯৭১ সালে ২৩ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে মাওলানা আহমেদুর রহমান আজমী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলায় উপনীত হন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা গ্রহণসহ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২০ ডিসেম্বর দেশে ফিরেন। এরশাদের বিরুদ্ধে স্বৈরাচার বিরোধী গণতন্ত্রের সংগ্রামে তিনি প্রথম কাতারের সৈনিক হিসাবে আন্দালনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমার পরিস্কার মনে আছে। এরশাদ স্বৈরাচার বিদায়ের শেষ মুহুর্তে মিছিলকারীদের দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর ঠিক ঐ মুহুর্তে মাওলানা ২০/২৫জন লোকের মিছিলে নেতৃত্বে দিয়েছেন ঢাকার রাজপথে। আজ অনেকে গণতন্ত্রের সুফল ভোগ করছে আর এই বিপ্লবী নেতা মাওলানাই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গণতন্ত্রের পথ সুগম করেছেন। মাতৃভাষা আন্দোলন, চুয়ান্ন’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, মুসলিম লীগের ভরাডুবি, ৬২ শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভুত্থান, একাত্তর সালে স্বাধীন বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ত্রিপুরার মনু বাজারে রিসিও ক্যাম্প করে মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসাবে ভূমিকা পালন করেন। এক কথায় বাঙালির নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে বহুমাত্রিক প্রতিরোধ সৃষ্টিকারীদের মধ্যে মাওলানা অন্যতম। তিনি ছিলেন একজন কৃষক নেতা। মাওলানা আজমীরাই সমাজের সৃষ্টীয় ইতিহাসের সৃষ্টির কেন্দ্র চরিত্র। পুরো পাকিস্তান আমলে প্রায় ৮ বছর জেল খেটেছেন। অবশিষ্ট সময় হুলিয়া মাথায় নিয়ে রাতের অন্ধকারে নিশাচর পাখির মতো কৃষক সমাজকে তাদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করেছেন। জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে জনসাধারণকে গণতন্ত্রের জন্য, স্বায়ত্ত শাসনের জন্য, স্বাধীনতা, গরিব মেহনতী মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সমাজতন্ত্র কায়েমের জন্য কাজ করেছেন। তার বক্তব্য ছিল সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ বিরোধী নিপীড়িত মানুষের প্রতি ঐক্যবন্ধ লড়াই করার আহবান। মাওলানা আজমী তার জীবন ও আদর্শ দেশবাসীর কাছে অমুল্য সম্পদ। আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের দেশপ্রেমিক, প্রগতি চিন্তার আলোকিত মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে হলে মাওলানা আজমীর জীবন আদর্শ অনুকরণীয়। ২০১১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ৮৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। লেখক : রাজনীতিক সূত্র-http://suprobhat.com/%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A6%B2%E0%A7%81%E0%A6%AE-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%93%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%86%E0%A6%9C%E0%A6%AE/ মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম, প্রকাশকাল-আগস্ট-২০১৩, পৃষ্ঠা নং-৮০৪