মুক্তিযুদ্ধে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান

Posted by ইরফানুল হক
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.

মিনারা বেগম ঝুনু: নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার দাউদ পুর গ্রামে ১৯৫২ সালের নভেম্বর মাসের ১ তারিখে জন্ম গ্রহণ করেন মিনারা বেগম ঝুনু৷ বাবা শামসুল ইসলাম ভুইয়া এবং মা জুবাইদা বেগম৷ ১৯৬৯ এর গণ অভ্যূথানের সময় থেকেই তিনি ছাত্রলীগের রাজনিতীর সাথে জড়িত ছিলেন। প্রথমে ঢাকার গভর্নমেন্ট ইন্টারমেডিয়েট গার্লস কলেজ এবং পরে তেজগাঁও কলেজে পড়া লেখা করেন মিনারা বেগম ঝুনু৷ কলেজ ছাত্রী হয়েও তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীর চর্চাকেন্দ্র এবং কলা ভবনে আরও অনেকের সাথে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন দেশের মুক্তির আশায়। এরপর দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ চালনার জন্য আরো বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্র চালনা, গেরিলা এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন ৷ ২৫ শে কাল রাত্রির গণ হত্যার প্রতক্ষ্য সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা মিনিরা বেগম ঝুনু। সেই রাতে ঢাকা ছিলেন। পরে ২৭ মার্চ রাতে কারফিউ শিথিল হলে রুপগজ্ঞ চলে যান। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন চলাচলে সাহায্য করতেন। তার সাথে স্থানীয় নারী ও শিশুদের গোয়েন্দা প্রশিক্ষন দিয়ে খবরা খবর সংগ্রহ করতেন। মুক্তিযোদ্ধা আলো রানী: মুক্তিযোদ্ধা আলো রানী চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ১৯৫৬ সালের ১১ই মে জন্ম গ্রহণ করেন । পুরো নাম আলো রাণী বৈদ্য। বাবা ক্ষিতিষ চন্দ্র বৈদ্য ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের সৈনিক৷ মা মালতী রানী বৈদ্য৷ ১৯৭১ সালে আবুল কাশেম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন আলো রানী৷ তার বাবার উৎসাহেই তাদের পুরো পরিবার স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। ভারতের হরিনা শিবিরের হাসপাতালে কাজ করেন, সেখান থেকে বিশ্রামগজ্ঞ হাসপাতাল ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগমে নেতৃত্বে সেবিকা হিসাবে কাজ করেন। তিনি দুই নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা। অঞ্জলি রায় গুপ্তা: ঝালকাঠির কীর্তিপাশা গ্রামে ১৯৪৫ সালের ৮ই জুলাই জন্মগ্রহণ করেন অঞ্জলি রায় গুপ্তা৷ বাবা: সুশীল কুমার রায় এবং মায়ের নাম শোভা রাণী রায়৷ ১৯৬১ সালে কীর্তিপাশা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন৷ এরপর বরিশালের চাখারে অবস্থিত ফজলুল হক কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন তিনি৷ পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ করেন৷ ১৯৭১ সালে অঞ্জলি রায় তিনি ঝালকাঠির শিরযুগ আজিমুন্নেছা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আশে পাশের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তার বাবা তাদের ভাইবোনদের বলেন : মরতে যখন হবেই তখন একটা পাকিস্তানি সেনা মেরে মরো। তারা পাঁচ ভাই বোন শ্যামল রায়, অঞ্জলি, সন্ধ্যা, মণিকা ও সুদীপ্তা সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে পেয়ারাবাগানে যুদ্ধে অংশ নেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পুরোনো কর্মস্থলে যোগ দেন অঞ্জলি রায় গুপ্তা৷ সেই বিদ্যালয়টিকে পরবর্তীতে কলেজ পর্যায়ে উত্তীর্ণ করেন৷ সেই কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০০৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন তিনি৷ তিনি নয় নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা। মেহেরুন্নেসা মেরী: ১৯৫৫ সালের ১২ই নভেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী থানায় জন্ম গ্রহণ করেন মেহেরুন্নেসা মেরী৷ পিতা : মোকছেদ আলী উজির এবং মা রহিমা বেগম৷ ১৯৭০ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলেজে ভর্তি হন মেহেরুন্নেসা৷ দেশ স্বাধীন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু কলেজ থেকে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন তিনি। আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে এমএ করেন মেহেরুন্নেসা। বাড়ির কাছে রাতইল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নূরুদ্দোহার কাছে আমরা নকল অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। দেশ স্বাধীন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু কলেজ থেকে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন তিনি। আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে এমএ করেন মেহেরুন্নেসা৷ ডা. সাইদুল ইসলামের অধীনে আমরা চিকিৎসা সেবা প্রদান দিতেন৷ এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র-শস্ত্রের হিসাব রাখতেন। সংরক্ষণ করতেন৷ কতগুলো অস্ত্র হারালো কিংবা কতগুলো যোগ হলো, অনেক সময় পাক সেনাদের পরাজিত করে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে আসতেন সেগুলোর হিসাব রাখতেন৷ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে কৌশলে গোলা বারুদ পৌছে দেওয়াও ছিল তার একটি কাজ। পড়ালেখা শেষ আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে এমএ করেন মেহেরুন্নেসা৷ শিক্ষাজীবন শেষে ব্যাংকিং পেশায় যোগ দেন৷ বর্তমানে সোনালী ব্যাংক-এ ঊর্ধ্বতন নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তিনি৷ সাথে লেখা লেখি করেন। তার প্রকাশিত বই এর সংখ্যা বার এর মত। মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা খাতুন: টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বহেরাতৈল গ্রামের সিরাজ উদ্দিন ও লাল জানের মেয়ে ফাতেমা খাতুন। কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি বহেরাতৈলে কর্মরত ছিলেন৷ খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য বহেড়াতৈল ক্যাম্প থেকে সখীপুরের কোকিলা পাবর, গোহাইল বাড়ি, রতনগঞ্জ ও মরিচাসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে যাতায়ত করতেন ফাতেমা খাতুন৷ এছাড়া বহেরাতৈল মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে অস্ত্র পাহারা দেওয়া, পরিস্কার করার কাজ করতেন৷ তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গ্রাম থেকে খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে আনতেন। কাওসার বেগম: ১৯৫৪ সালের ৩১শে মার্চ চট্টগ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন কাওসার বেগম৷ বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান মাওলানা মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান এবং মা নূরুন্নেসা৷ পৈত্রিক বাড়ি ফেনী। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন কাওসার বেগম৷ তাঁদের ছয় ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে কয়েকজন ছাত্রলীগের সামনের সারির নেতা ছিলেন৷ তাঁর এক ভাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভাইস-প্রেসিডেন্ট আর আরেক ভাই ছিলেন ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক৷ যুদ্ধের শুরুতে বিহারিদের অত্যাচার দেখেছেন খুব কাছ থেকে। বিহারিরা তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। ভারতে গিয়ে সূর্যমনি শরণার্থী শিবিরে ওঠেন কাওসার বেগম৷ সেখানে প্রথমে অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ নেন৷ কিন্তু আহত মুক্তিযোদ্ধাদের করুণ অবস্থা দেখে তিনি পরে তাদের চিকিৎসা সেবা দেওয়াটাকেই তার কাছে জরূরী হয়৷ তাই পরে সেবিকা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে জেবি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার কাজে যোগ দেন৷ দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত সেবিকা হিসেবে আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন কাওসার বেগম এবং তাঁর বোন সালেহা বেগম৷ স্বাধীন দেশে ফিরে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করেন কাওসার বেগম৷ এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন কাওসার বেগম৷ ১৯৮১ সালে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পরিদর্শক পদে যোগ দেন৷ নাজনীন বানু: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ১৯৫৬ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর জন্ম গ্রহন করেন নাজনীন বানুর৷ পিবাবার নাম গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, মা সাকিবুন্নেসা৷ দাউদপুর-পুটিনা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন নাজনীন বানু। বিদ্যালয় জীবনেই ছাত্রলীগের সাথে জড়িত হন নাজনীন বানু৷ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি বিদ্যালয় থেকে নিজ হাতে পতাকা নিয়ে মিছিলে নেতৃত্ব দেন৷ ১৯৭০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করে কলেজে ভর্তির কথা ভাবছিলেন নাজনীন৷ তবে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ঢাকায় গিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয়নি৷ মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখতেন, যত্ন নিতেন। বিভিন্ন খোজ খবর , তথ্য যোগাড় করতেন কৌশলে। তার এবং তার সঙ্গীদের তথ্যের উপর অনেক সময় নির্ভর করে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালাতো বা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকায় গিয়ে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন নাজনীন৷ সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং পরে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি৷ তবে ১৯৭৩ সালেই তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন৷ পরবর্তীতে আরো ভালো ভালো চাকুরির সুযোগ পেলেও তিনি মনে করেন যে, পরবর্তী প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও মূল্যবোধ দিয়ে গড়ে তুলতে হলে তাদেরকে বিদ্যালয়ের প্রথম ধাপেই সঠিক শিক্ষা দিতে হবে৷ তাই অন্য কোন পেশায় না গিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন নাজনীন বানু৷ বর্তমানে ঢাকায় দিলকুশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি৷ তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, ছবি: প্রতিকী