মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতিবিজড়িত কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার অলিপুর ও মধ্যগ্রাম

Posted by ইরফানুল হক
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.
পুকুরের পাড়ে চারজনকে এক সারিতে দাঁড় করানো হয়। তারপর পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয় সবাইকে। একাত্তরের ২৭ জুন এ হত্যাযজ্ঞ ঘটে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার অলিপুর গ্রামের দর্জি বাড়ির দক্ষিণে ডাক্তার বাড়ির পুকুরের উত্তর পাশে। চার শহীদের সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানেই এখন দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চান্দিনা উপজেলা কমান্ডের সহকারী কমান্ডার আলী আকবর দর্জি ও এ হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী সুহিলপুরের মোজাফফর হোসেন। অলিপুর গ্রামের চার মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যাযজ্ঞ দূর থেকে দেখেছেন মোজাফফর হোসেন। তিনি বলেন, তখন আমি কেবল বুঝতে শিখেছি। বর্ষাকাল হওয়াতে চারপাশ পানিতে থৈ থৈ করছে। একা একা মাছ ধরার জন্য বের হয়েছি। দুইটা কি আড়াইটা বাজে। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। দেখি একটি নৌকায় করে কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য চারজন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে আসে। তারপর পুকুরের পাড়ে পূর্ব দিকে ফিরে সবাইকে দাঁড় করিয়ে পেছন থেকে গুলি করে পাকিস্তানি সৈন্যরা। গুলি খেয়ে সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে লাশগুলো পাকিস্তানিরা পানিতে ভাসিয়ে দেয়। পরে জেনেছি তাদের ইলিয়টগঞ্জ থেকে ধরে আনা হয়েছে। আলী আকবর দর্জি বলেন, এখানে হত্যা করা চার মুক্তিযোদ্ধার নাম-ঠিকানা বা পরিচয় আমাদের জানা নেই। লাশগুলোও তখন পানিতে ভেসে গেছে। তবে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এখনও এ পুকুর ও পুকুরের পাড় আছে। আর এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এখানকার অনেক বয়স্ক লোকই জানেন। আমি এ রাস্তা দিয়েই বাড়িতে যাতায়াত করি। তাই যখন এ পুকুর পাড় দিয়ে হাঁটি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে অজানা সেই চার শহীদের মুখচ্ছবি। ইচ্ছা আছে এ চার শহীদের স্মরণে এ পুকুরপাড়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ গড়ব, যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম এ চার শহীদ ও মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে পারে। পুকুরপাড় থেকে একটু সামনে মধ্যগ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির প্রাঙ্গণে। নির্জন এ মন্দির প্রাঙ্গণেও পাকিস্তানিরা গুলি করে হত্যা করে পাঁচ মুক্তিযোদ্ধাকে। আজও জানা যায়নি এ পাঁচ শহীদের পরিচয়। এ পাঁচ মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে হত্যার দৃশ্য দূর থেকে দেখেছেন সুহিলপুর গ্রামের সলিম মিয়া। তিনি বলেন, তখন আমার বয়স খুব বেশি হবে না। কেবল বুঝতে শিখেছি। জুন বা জুলাই মাস হবে। বর্ষার পানিতে গ্রামের অনেক স্থানই পানিতে তলিয়ে। তবে মন্দিরের জায়গাটি উঁচুতে ছিল। বেলা তিনটা বা চারটার সময়। আমি কোনো একটা কাজে ঘর থেকে বের হয়েছি। দেখি কয়েকজন পাকিস্তানি পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নৌকায় করে নিয়ে আসে এ মন্দিরে। তারপর গুলি করে হত্যা করে তাদের। লাশগুলো এখানেই পচে-গলে ভেসে যায় বর্ষার পানিতে। তখন গ্রামে মানুষ কম ছিল। আর পাকিস্তানিদের ভয়ে খুব একটা ঘর থেকে বেরও হতো না। তাই লাশের ধারে তেমন কেউ আসেনি। শুনেছি তাদের ইলিয়টগঞ্জ থেকে ধরে আনা হয়। ছবি ও তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর