যুবতিদের নগ্ন করে শিকল দিয়ে বেঁধে গোসল করানো হতো নদীতে-মুক্তিযোদ্ধা তোবারককে এখনো কাঁদায় সেই দৃশ্য

Posted by Anwar Hossan
Feb. 19, 2019, 4:44 p.m.
পাকিস্তানি সেনারা বাঙালি যুবতিদের নগ্ন করে শিকল দিয়ে বেঁধে গোসল করাতো নদীতে। খাগড়াছড়ির রামগড়ে ফেনী নদীতে হানাদারদের হাতে নারী নির্যাতনের সেই দৃশ্য এখনো কাঁদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা তোবারক হোসেনকে। জীবনবাজি রেখে শুভপুর সেতু ধ্বংসসহ নানা সফল অপারেশনে অংশ নেন তোবারক হোসেন। তিনি মিরসরাই উপজেলার করেরহাটের মরহুম শেকান্তর আহম্মেদের ছেলে। তাঁর বড়ভাই মরহুম আলতাফ হোসেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গঠিত নিউক্লিয়াসের অন্যতম সদস্য এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্ত্রী রাশেদা আক্তার, তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তোবারক হোসেনের সুখের সংসার। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। মিরসরাই উপজেলা বিআরডিবির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে হানাদারদের চট্টগ্রামে ঢুকতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মিরসরাইয়ের শুভপুর সেতু। অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতেই সেতুর এক কিলোমিটার দক্ষিণে করেরহাটে গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এ টি এম ইসমাঈল মিন্টু মিয়া ছিলেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। একাত্তরের ২৫ মার্চ কালো রাতে তত্কালীন আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জিতেন্দ্র প্রসাদ নাথ মন্টু, শাহ আলম চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ নেতা মিহির চৌধুরী আসেন করেরহাটে। স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির নেতাদের ডেকে তাঁরা বললেন, কুমিল্লা সেনাক্যাম্প থেকে পাকিস্তানি আর্মি যেন চট্টগ্রাম অভিমুখে যেতে না পারে, সেই জন্য শুভপুর সেতু ধ্বংস করতে হবে। নেতাদের ডাকে স্কুলপড়ুয়া ১৭ বছরের টগবগে তরুণ তোবারক হোসেন আর ঘরে থাকতে পারেননি। শুভপুর সেতু ধ্বংসের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে জড়িয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। ওই সময় তাঁর অগ্রজ সারথী ছিলেন মির্জা ফিরোজ, ডা. গোফরান, ইঞ্জিনিয়ার এরফানুল হক, মাঈন উদ্দিন আহম্মেদ, আবুল কাশেম, ফিরোজ আহম্মেদ, মোশাররফ হোসেন বিকম, অধ্যাপক ম আবছার, আহম্মেদ হোসেনসহ আরো অনেকে। শুভপুর সেতু ধ্বংসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা তোবারক জানান, ২৫ মার্চ রাতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নির্দেশ পাওয়ার পর তড়িঘড়ি করে চারদিকে মুক্তিকামী জনতাকে খবর দেওয়া হলো। করেরহাট বাজারের মজুমদারের পেট্রলপাম্প থেকে পেট্রল, কেরোসিন ও ডিজেল সংগ্রহ করা হলো। আশপাশের বাড়িঘর থেকে আনা হল শুকনো লাকড়ি। করেরহাট সিএমবি অফিস (বর্তমানে সড়ক ও জনপথ অফিস) থেকে নেওয়া হল বিটুমিনভর্তি ড্রাম। রাত দেড়টার দিকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে তাঁরা ২০/৩০ জন সেতুতে প্রতিরোধ সৃষ্টির চেষ্টা চালান। রাত যত গভীর হচ্ছিল ততই মানুষের সমাগম বাড়ছিল। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ সেতুর পাশের একটি খড়ের ঘর ভেঙে সেতুর পাটাতনে আগুন ধরিয়ে দেন। এর পর তিনি সবাইকে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেন এবং শুভপুর সেতু ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পরদিন সকাল আটটার দিকে তত্কালীন গণপরিষদ সদস্য ফেনীর খাজা আহম্মদ খবর পাঠালেন, ‘শুভপুর সেতু ধ্বংস করে তোমরা খান সেনাদের গতিরোধ কর।’ তোবারক হোসেন বলেন, ‘সেদিন বেলা ১২টার দিকে ফেনীর দিক থেকে পাকিস্তানি আর্মির গাড়ির একটি বহর সেতুর উত্তর প্রান্তে এসে থামে। আমরা কিছুক্ষণের জন্য সরে দাঁড়াই। পরে শত্রুরা সেতুর ওপর জ্বালানো আগুন নিভিয়ে গাড়ির বহর পার করে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তবে সেতু পাহারা দেওয়ার জন্য ১৫/২০ সেনাকে সেখানে রেখে যায়।’ এরই মধ্যে সেতু ধ্বংস করার জন্য বেশ কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টা চলে। ২৯ মার্চ বিকেলে করেরহাট কে এম হাই স্কুল মাঠে সংগ্রাম কমিটির এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে সর্বস্তরের জনতা দা, কুড়াল, কোদালসহ যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শুভপুর সেতু প্রতিরোধ এবং ধ্বংস করতে এগিয়ে যান। তখন কয়েকজন পুলিশ ও ইপিআর সদস্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যোগ দেন। সেদিনও সেতু ধ্বংস করা যায়নি। ৩১ মার্চ করেরহাটের তুলাতলিতে সংগ্রাম কমিটির আবার বৈঠক হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভূঁইয়া, ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের ও সেকেন্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের সুবেদার মঈন উদ্দিন। বৈঠকে সেতু ধ্বংসের রণকৌশল নির্ধারণ হয়। ‘৩১ মার্চ রাত শেষে ভোরে আকাশে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী সেতু আক্রমণ করি। সেতুর দক্ষিণে থেকে অপারেশনে নেতৃত্ব দেন ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভূঁইয়া এবং উত্তর পাশে ছিলেন ক্যাপ্টেন আফতাবুল ইসলাম ও সুবেদার মঈন উদ্দিন। আক্রমণের মুখে পাহারায় থাকা পাকিস্তানি সেনারা বাংকারে ঢুকে পড়ে। উত্তর পাশে থাকা ছয় পাকিস্তানি আর্মি গ্রেনেড হামলায় মারা যায়। দক্ষিণেও মারা যায় আরো ৬/৭জন। আমরা ভেবেছিলাম সব শত্রু গ্রেনেড হামলায় মারা গেছে। এক পর্যায়ে সুবিদ আলী ভূঁইয়ার নেতৃত্বে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে তিন ইপিআর সদস্য পাকিস্তানিদের বাংকারের দিকে এগিয়ে যেতেই ব্রাশফায়ার করে ওরা। এতে ওই তিনজন শহীদ হন। তাঁদের একজন আবুল হোসেন। অন্যদের নাম মনে নেই। পরে বেঁচে থাকা চার পাকি সেনা গুলি ছুড়তে ছুড়তে পিছু হটে অলিনগরের দিকে পালিয়ে যায়। সেখানে জনতা একজনকে ধরে পিটুনি দিয়ে মেরে ফেলে। এভাবেই শুভপুর সেতু অপারেশন হয় সফল।’- বলেন তোবারক হোসেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘এপ্রিলের প্রথম থেকে আমরা করেরহাটের সরকারতালুক গ্রামে দুটি লঙ্গরখানা খুলি। সেখানে খাবার রান্না করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাঠাতাম। সাধারণ মানুষ চাল-ডাল, খিরা, মিষ্টি কুমড়া, মুলাসহ বিভিন্ন শাকসবজি পাঠাতো লঙ্গরখানায়।’ এপ্রিলের মাঝামাঝি এম এ হান্নান, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, এইচ টি ইমাম (তত্কালীন রামগড়ের এসডিও), তত্কালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মির্জা মনসুর ও শ্রমিক নেতা এ টি এম নিজাম উদ্দিনের সঙ্গে তোবারক হোসেনও ফেনী নদীর রামগড় এলাকা হয়ে ভারত যান। সেখানে সাব্রুমে তিনদিন থাকার পর হরিণা এলাকায় একটি পাহাড় পরিষ্কার করে তাঁবু টাঙিয়ে ক্যাম্প করা হয়। পরে সেটি ‘হরিণা ইয়ুথ ক্যাম্প’ নামে পরিচিতি পায়। সেখানে বাঙালি শরণার্থীদের রেখে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। প্রায় ২৪ দিন প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে তোবারক যুদ্ধে যোগ দেন এক নম্বর সেক্টরের কম্পানি কমান্ডার মাঈন উদ্দিনের অধীনে। যুদ্ধকালীন একটি দুঃসহ স্মৃতি তোবারককে এখনো কাঁদায়। তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণের জন্য ভারত যাওয়ার পর ফেনী নদীর তীর থেকে প্রায়ই সকালে দেখতাম নারী নির্যাতনের দৃশ্য। রামগড়ে একটি পাকিস্তানি ক্যাম্পে বাঙালি যুবতিদের নগ্ন করে শিকল দিয়ে বেঁধে নদীতে গোসল করানো হতো। আর রাতে তাঁদের আহাজারিতে নদীর দুই পাশের পাহাড়ও কেঁদে ওঠত।’ মিরসরাই মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার কবির আহমদ বলেন, ‘তোবারক হোসেন একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। প্রগতিশীল নানা আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।’ সূত্র- http://www.kalerkantho.com/home/printnews/437698/2016-12-06